
“শেরশাবাদিয়া ভাষার গৌরব—কলকাতা ভাষা মেলা ২০২৫-এ আমাদের ঐতিহাসিক মুহূর্ত”
আজ আমার জীবনের এমন এক দিনের কথা আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই, যা আমি কোনওদিন ভুলতে পারব না। কলকাতার নিউ টাউনে অবস্থিত বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে, ৮–১০ ডিসেম্বর ২০২৫-এ অনুষ্ঠিত হলো ভাষা মেলা ২০২৫—একটি মহৎ, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত উৎসব। আর সেই উৎসবের প্রধান আকর্ষণগুলোর মধ্যে ছিল—শেরশাবাদিয়া ভাষার সম্মানজনক স্বীকৃতি ও পুরস্কার অর্জন।
আমি নিজে সেখানে উপস্থিত ছিলাম, মঞ্চে গান পরিবেশন করেছি, আর আমার চোখের সামনে দেখেছি— আমাদের শেরশাবাদিয়া ভাষার ইতিহাসে এক অমর অধ্যায় রচিত হলো।
সেই মুহূর্তের ছবিটাই এখানে আপনাদের সামনে তুলে দিলাম— দু’হাতে পুরস্কার গ্রহণ করে আছেন আমাদের শ্রদ্ধেয় প্রফেসর ড. আব্দুল ওহাব, আর আমি দাঁড়িয়ে আছি তাঁর পাশে, হাতে ফুলের তোড়া। এই দৃশ্য শুধু আনন্দের নয়, আমাদের ভাবী প্রজন্মের ইতিহাস।
🌿 ড. আব্দুল অহাব: শেরশাবাদিয়া ভাষার স্বপ্ন–সাধক
আমাদের শেরশাবাদিয়া ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও লোকজ জ্ঞানের যে কতটা মূল্য, কতটা গভীরতা আছে—তা বিশ্বমানচিত্রে তুলে ধরার যে দায়িত্ব কেউ নীরবে পালন করে এসেছেন, তিনি হলেন ড. আব্দুল ওহাব।
ভাষা মেলা ২০২৫-এর Language & Culture Award প্রদান করা হয়েছে তাঁকে— ✔ শেরশাবাদিয়া ভাষার গবেষণা, ✔ তার ইতিহাস সংরক্ষণ, ✔ সাহিত্য, শব্দভাণ্ডার, লোকগীতি, সংস্কৃতি, ✔ এবং গৌড়বঙ্গের মানুষের পরিচয়কে একাডেমিক জগতে প্রতিষ্ঠা করার জন্য।
মঞ্চে পুরস্কার নেওয়ার পর তাঁর কণ্ঠে শুনলাম যে কথা আজও আমার মনে বাজছে—
“একটি ভাষা শুধু যোগাযোগ নয়। ভাষার বুকেই থাকে আমাদের স্মৃতি, আমাদের ইতিহাস, আমাদের সমাজের আত্মা। শেরশাবাদিয়া ভাষা বাঁচুক আগামী প্রজন্মের কণ্ঠে।”
আমি যখন তাঁর হাতে ওই সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো পুরস্কারটি দেখলাম, তখন মনে হচ্ছিল— এ শুধু একজন শিক্ষকের স্বীকৃতি নয়; এ আমাদের পুরো শেরশাবাদিয়া সমাজের সম্মান।
🎶 আমার সাংস্কৃতিক পরিবেশনা—শেরশাবাদিয়া গানের গর্বিত মঞ্চে
এই অনুষ্ঠানে আমাকে শেরশাবাদিয়া ভাষার প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আমি পরিবেশন করেছি—
🎵 “আমি বসবো না, বোঝবো না রে গীত” আমার নিজের লেখা ও সুর করা 🎵 “চলে গেছো তাও” 🎵 “শাগ লরি লরি - ঝাওলি”
বিশ্ব বাংলা কনভেনশনের সেই বিশাল অডিটোরিয়ামে, ৪৮টি ভাষার মানুষের সামনে যখন আমি শেরশাবাদিয়া ভাষায় গান শুরু করলাম, তখন যেন বুকের ভেতর থেকে উঠে এলো এক অদ্ভুত শক্তি, এক অদ্ভুত গর্ব।
কারণ আমি জানি— আমি গান গাইছি শুধু নিজের জন্য নয়; গাইছি আমার গ্রামের মানুষ, আমার সমাজ, আমার পূর্বপুরুষদের জন্য।
গান শেষে যখন হলজুড়ে করতালি উঠল, তখন মনে হলো— অবশেষে শেরশাবাদিয়া ভাষা তার প্রাপ্য সম্মান পাচ্ছে।
সেদিন আমি নিজেকে প্রথমবার “শেরশাবাদিয়া সংস্কৃতির দূত” বলে অনুভব করলাম।
🌍 ৪৮টি ভাষার মিলনমেলা
এই ভাষা মেলায় অংশগ্রহণ করে মোট ৪৮টি ভাষা, এবং প্রতিটি ভাষার অন্তত দু’জন প্রতিনিধি।
বাংলা, সাঁওতালি, কুড়মালি, টোটো, কোচ, রাবা, বড়ো, মৈথিলি, বাংলা উপভাষা, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন উপজাতীয় ভাষা থেকে শুরু করে— আমাদের শেরশাবাদিয়া ভাষাও উঠে আসে প্রধান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
চাঁই ভাষার প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সমীর কুমার মন্ডল। তিনি বলেন," একটা ভাষা একটা জাতির পরিচয় বহন করে, যে জাতির ভাষা থাকে না সেই জাতি ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে যায়। ফলে ভাষাকে টিকিয়ে রাখা মানে একটা জাতিকে বাঁচিয়ে রাখা।"তিনি প্রত্যেককে সেই জাতির স্বার্থে সেই ভাষাচর্চা নিরন্তর চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
এই মেলা উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. ব্রাত্য বসু — যা অনুষ্ঠানটির মর্যাদা আরও বাড়িয়ে তোলে।
🌼 শেরশাবাদিয়ার ইতিহাসে মাইলফলক
ড. ওহাবের হাতে পুরস্কার এবং আমার সাংস্কৃতিক পরিবেশনা— এই দুটি ঘটনা শেরশাবাদিয়া সমাজের জন্য শুধু গর্ব নয়, এটি একটি ঘোষণা—
**“হ্যাঁ, আমরাও আছি।
আমাদের ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কণ্ঠও শোনা উচিত।”**
গৌড়বঙ্গের ভাষা ও সংস্কৃতি আজ রাজ্য সরকারের অফিসিয়াল ভাষা মঞ্চে স্বীকৃতি পেল। এটি আগামী প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণা। তারা জানবে— নিজের ভাষা লুকিয়ে রাখা নয়, ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখাই শক্তির পরিচয়।
❤️ আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি
সেদিনের সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে, ফুল হাতে ওহাব স্যারের পাশে দাঁড়িয়ে আমি অনুভব করেছি—
আমি আমার সমাজের প্রতিনিধি।
আমার গানের প্রতিটি শব্দ আমাদের ভাষার প্রতি ভালোবাসা।
আমি সৌভাগ্যবান যে আমি সেই ইতিহাসের সাক্ষী।
শেরশাবাদিয়া ভাষা আজ শুধু লোকমুখের ভাষা নয়— একাডেমিক গবেষণা, সাংস্কৃতিক মঞ্চ ও রাজ্য সরকারের স্বীকৃত ভাষা।
আমার চোখ ভরে এসেছিল। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে ছায়ায় থাকা শেরশাবাদিয়া আজ আলোয় এসেছে। এ আলো আরও জ্বলুক, আরও ছড়াক— এই আমাদের প্রত্যাশা।
🌟 ড. ওহাব—আমাদের পথপ্রদর্শক, আমাদের গর্ব
তাঁর কাজ শুধুই গবেষণা নয়— তিনি আমাদের ভাষার ইতিহাস রক্ষা করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন— যে ভাষার বই নেই, তাকে বই দেওয়া যায়। যে ভাষার পরিচয় নেই, তাকে পরিচিত করা যায়। যে ভাষাকে কেউ মূল্য দেয় না— তাকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
আজকের এই পুরস্কার তাঁর মতো একজন পথিকৃৎকে যথার্থ সম্মান জানিয়েছে।
সেদিন তিনি আমাকে বললেন—
“রহিম, গান চালিয়ে যাও। তোমার গানই একদিন শেরশাবাদিয়ার পরিচয় হয়ে দাঁড়াবে।”
এ কথা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা।
🕊️ শেষ কথা — আজ গর্বের দিন, আনন্দের দিন
আমাদের শিকড়কে যারা অবহেলা করেছে, তারা আজ জানবে— শেরশাবাদিয়া ভাষা শুধু ভাষা নয়— এটি ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয়।
যারা গান ভালোবাসে, ভাষা ভালোবাসে, শেরশাবাদিয়া ভালোবাসে— তাদের সবাইকে এই সাফল্য উৎসর্গ করছি।
আজ আমি সত্যিই গর্বিত। আজ আমাদের দিন। আজ শেরশাবাদিয়া ভাষার জয়।
“ভাষা বাঁচলে সমাজ বাঁচে—আর সমাজ বাঁচলে আমরা বাঁচি।”
Comments
Post a Comment